৪০ এবং ৪১ তম বিসিএস লিখিত প্রস্তুতি নির্দেশনা

বিসিএস : লিখিত পরীক্ষার মহারণে
বাংলা প্রথম ও দ্বিতীয় পত্র ভালো করার পরামর্শ
রিদওয়ান ইসলাম
৩৩তম বিসিএসে সম্মিলিত মেধাতালিকায় প্রথম
.
বিসিএস লিখিত পরীক্ষা শুধু পাস-ফেলের পরীক্ষা নয়। ভালো নম্বর পেয়ে পাস করার পরীক্ষা। ভালো নম্বর না পাওয়া আর ফেল করা এখানে প্রায় সমান কথা। ভালো নম্বর তুলতে না পারলে ভালো ক্যাডার পাওয়া যাবে না। তাই প্রস্তুতিটাও হওয়া চাই তেমন। ১০০ নম্বর বরাদ্দ বাংলা প্রথম পত্রে। দ্বিতীয় পত্রে আরো ১০০। প্রথম পত্র সাধারণ ও টেকনিক্যাল উভয় ক্যাডারের প্রার্থীদের। বাংলা দ্বিতীয় পত্র শুধু সাধারণ ক্যাডারের জন্য। মায়ের ভাষা বলে অনেকেই বাংলাকে হেলাফেলা করেন। হেলাফেলা করলেই সর্বনাশ। বিসিএস লিখিত পরীক্ষায় যেকোনো বিষয়ই গড়ে দিতে পারে বড় ব্যবধান। আর লিখিত পরীক্ষার মহারণে বাংলা তো অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ঢাল-তলোয়ার মানে পুঁজি নিয়েই লড়াইয়ে নামুন। রণক্ষেত্রে এটিই এগিয়ে রাখবে প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে। মেধা নিশ্চয়ই আছে। একটুখানি কৌশলী, বাকিটা পরিশ্রমী হলে জয় আপনার হবেই হবে।
.
কোন অংশে কত
.
প্রথমেই চোখ বুলিয়ে নিন সিলেবাসে। জানেন নিশ্চয়ই, ৩৫তম বিসিএস থেকে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে নতুন সিলেবাসে। প্রথমেই বাংলা প্রথম পত্র। ব্যাকরণ অংশে বরাদ্দ ৩০ নম্বর। প্রশ্ন করা হবে শব্দগঠন, বানান বা বানানের নিয়ম, বাক্যশুদ্ধি বা প্রয়োগ-অপপ্রয়োগ, প্রবাদ-প্রবচন ও বাক্যগঠন থেকে। লিখতে হবে ভাবসম্প্রসারণ ও সারমর্ম। প্রতিটিতে নম্বর বরাদ্দ ২০ করে। বাকি ৩০ নম্বর বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে। এ অংশে শর্ট টাইপের প্রশ্ন বেশি হতে পারে।
.
দ্বিতীয় পত্রে ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ, কাল্পনিক সংলাপ লিখন, পত্রলিখন, গ্রন্থ সমালোচনা—প্রতিটিতে ১৫ নম্বর করে মোট ৬০ নম্বর বরাদ্দ। সবচেয়ে বেশি নম্বর রচনা লিখনে। এতে থাকবে ৪০ নম্বর।
.
সিলেবাস ও প্রশ্ন দেখে প্রস্তুতি
.
প্রথমেই সিলেবাসে চোখ বুলিয়ে নিন। তারপর নজর দিন বিসিএসে আসা বিগত বছরের প্রশ্নগুলোর দিকে। এতে প্রশ্ন কেমন হতে পারে, সে বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা পেয়ে যাবেন। দশম থেকে ৩৬তম বিসিএসের ব্যাকরণ ও সাহিত্য প্রশ্ন প্রস্তুতিতে কাজে আসবে। বিগত সালের পরীক্ষায় আসা ব্যাকরণ, শুদ্ধিকরণ, প্রবাদ-প্রবচন ও বাগধারা, বিভিন্ন ধরনের পত্র লেখার নিয়ম ভালো করে পড়ুন।
.
দরখাস্ত, মানপত্র বা চিঠি ইত্যাদি লেখার নিয়ম আয়ত্ত করতে পারলে প্রশ্ন যে রকমই হোক না কেন, উত্তর লিখে আসতে পারবেন। বিগত সালে পরীক্ষায় আসা সারমর্ম বা সারাংশ ও ভাবসম্প্রসারণের উত্তর বানিয়ে লেখার অভ্যাস করুন। যত বেশি অনুশীলন করবেন, তত লাভ হবে।
.
দরকারি বইপত্তর
.
হুমায়ুন আজাদের 'লাল নীল দীপাবলি অথবা বাঙলা সাহিত্যের জীবনী' বইটি বেশ কাজের। বইটিতে বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনকাল থেকে আধুনিককাল পর্যন্ত ইতিহাস খুব সুন্দরভাবে সহজ-সরল ভাষায় লেখা। মাহবুবুল আলমের 'বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস' বইটিও পড়তে পারেন। ব্যাকরণ অংশের জন্য হুমায়ুন আজাদের 'কতো নদী সরোবর অথবা বাঙলা ভাষার জীবনী' বইটি বেশ সহায়ক হবে। এ ছাড়া নবম-দশম শ্রেণির বোর্ডের বাংলা ব্যাকরণ বই তো আছেই। বাংলা বানান, শুদ্ধিকরণ প্রভৃতি নিয়ে মাথাব্যথার কারণ নেই। এগুলোর জন্য বাংলা একাডেমি প্রণীত ব্যবহারিক বাংলা অভিধানের একেবারে শেষে 'প্রমিত বাংলা বানান' নামে একটি অধ্যায় আছে। মনোযোগ দিয়ে এই অংশটা দেখলে বানান বিষয়ে ভালো ধারণা পাবেন।
.
এগিয়ে থাকবেন সৃজনশীলরাই
.
একটুখানি খেয়াল করলেই দেখবেন, লিখিত পরীক্ষায় দুই ধরনের প্রশ্ন করা হয়ে থাকে। একটি ব্যাখ্যামূলক, যাতে পূর্ণ নম্বর পাওয়া যায় না। যেমন রচনা, ভাবসম্প্রসারণ। আর অন্যটি হলো সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন, মানে ব্যাকরণ। এতে পূর্ণ নম্বর পাওয়া যায়। নম্বর বিভাজনের দিকে ভালো করে খেয়াল করলে দেখবেন, ২০০ নম্বরের মধ্যে ১৪০ নম্বরেই মুখস্থবিদ্যার বালাই নেই। ভাবসম্প্রসারণ, সারমর্ম, বাংলা অনুবাদ, কাল্পনিক সংলাপ লিখন, পত্রলিখন, গ্রন্থ সমালোচনা, রচনা লিখন সাধারণত কমন পড়ে না। এতে লিখতে হবে নিজের ভাষায় কিংবা বুঝেশুনে। এ ক্ষেত্রে যেটা করবেন তা হলো, এগুলো লেখার সাধারণ নিয়মগুলো জেনে যাবেন। মাথায় রাখবেন প্রয়োজনীয় সব তথ্য-উপাত্ত। এর সঙ্গে চর্চাটা যোগ করলেই হলো, তাতেই সই।
.
বুঝতেই পারছেন, প্রার্থীকে নিজের মতো ভাবনাচিন্তার ও লেখার স্বাধীনতা দেওয়া হয় এই লিখিত পরীক্ষায়। কেউ যদি কোনো বিষয় সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখেন, তবে নিজের মতো করে উপস্থাপন করার সুযোগ পায়। তাই সৃজনশীলরাই এতে এগিয়ে থাকে।
.
প্রস্তুতি নেবেন যেভাবে
.
ব্যাকরণ অংশে কিছু টপিকস নির্দিষ্ট আছে। যেমন শব্দগঠন, বানান ও বানানের নিয়ম, বাক্যশুদ্ধি ও প্রয়োগ-অপপ্রয়োগ, প্রবাদের নিহিতার্থ ব্যাখ্যা ও বাক্যগঠন মনোযোগ দিয়ে পড়লে অল্প সময়ে এর জন্য ভালো প্রস্তুতি নেওয়া যায়। ব্যাকরণ অংশের জন্য কতো নদী সরোবর অথবা বাঙলা ভাষার জীবনী, বাংলা ভাষার ব্যাকরণ, ভাষা-শিক্ষা, দর্পণ বুঝে বুঝে পড়তে হবে। ভাবসম্প্রসারণের জন্য দেখতে পারেন দর্পণ ও ভালোমানের আরো দু-একটি বই। সহজ-সুন্দর ভাষায় ২০টি প্রাসঙ্গিক বাক্য লিখলেই চলে ভাবসম্প্রসারণে। উদাহরণ আর উদ্ধৃতি দিলে মান বাড়বে। সারমর্ম লিখতে হবে তিন-চারটি সহজ-সুন্দর বাক্যে।
.
সাহিত্য অংশটির পরিধি বেশ বড়। তাই যেটা করবেন, পিএসসি নির্ধারিত লেখক সম্পর্কে প্রথমে ভালো করে পড়বেন। তারপর বাছাই করে অন্য লেখকদের সাহিত্যকর্ম দেখবেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যবিষয়ক প্রশ্নের উত্তর লাল-নীল দীপাবলি, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস—বইগুলো থেকে অপ্রয়োজনীয় অংশগুলো বাদ দিয়ে পড়তে পারেন। উদ্ধৃতি দিলে এতে নম্বর বেশি পাবেন।
.
গ্রন্থ সমালোচনা কঠিন ঠেকতে পারে। গ্রন্থ সম্পর্কে না জানলে বা বইটি না পড়ে থাকলে লিখতে পারবেন না। তাই এই অংশে সময় দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিখ্যাত বইগুলোই পড়বেন। যদিও এ রকম বইয়ের তালিকাটাও বেশ দীর্ঘ। তবে অনেকেই জেনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন, বিগত দুই বিসিএসে গ্রন্থের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। প্রশ্ন করা হয়েছিল থিম উল্লেখ করে।
.
অনুবাদে অনুশীলন
.
অনুবাদ পড়ে না। অনেকের কাছেই এটি সবচেয়ে কঠিন ঠেকে। দৈনিক পত্রিকার আর্টিকেল আর সম্পাদকীয় থেকে একটি বাংলা থেকে ইংরেজি আর একটি ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদের চর্চা করুন প্রতিদিন, কাজে আসবে। এতে আপনার আরো কিছু অংশের প্রস্তুতি হয়ে যাবে। আর কারো যদি ইংরেজির মৌলিক জ্ঞান ভালো থাকে, তবে অনুবাদ এমনিই পারবেন।
.
কাল্পনিক সংলাপের জন্য পেপারে গোলটেবিল বৈঠকগুলোর মিনিটস্, টক শো, গাইড বই থেকে বিভিন্ন টপিক সম্পর্কে ধারণা নিন। ভাষা-শিক্ষা আর বিভিন্ন গাইড বই থেকে পত্রলিখন পড়তে পারেন।
.
জোর দিন রচনায়
.
বাংলায় সবচেয়ে বেশি নম্বর বরাদ্দ রচনা লিখনে। এতে থাকবে ৪০ নম্বর। রচনা আসতে পারে সমসাময়িক কোনো ইস্যু, জাতীয় সমস্যা ও সমাধান, মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা-আন্দোলন, সাহিত্য ও সংস্কৃতি, তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ে। বাংলা রচনা কতটুকু লিখবে—এ নিয়ে অনেকের চিন্তার শেষ নেই। অনেকেরই ধারণা, যত বেশি লেখা যায় নম্বর তত বেশি। এটা মোটেই ঠিক নয়। প্রাসঙ্গিক তথ্য-উপাত্ত ছাড়া যদি অযথাই পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ভরাট করে যান, তাতে খুব বেশি ফায়দা হবে না। এটা পরীক্ষকের বিরক্তির উদ্রেক ঘটাতে পারে। রচনা যত বেশি তথ্য-উপাত্তসমৃদ্ধ করতে পারবেন, ততই ভালো। রচনায় ভালো করার জন্য দৈনিক পত্রিকাগুলোর সম্পাদকীয় পাতা নিয়মিত পড়লে কাজে দেবে। টপিক ধরে ধরে ফ্রিহ্যান্ড লেখার অভ্যাসও এগিয়ে রাখতে পারে।
.
উপস্থাপনার ওপর অনেক কিছু
.
অনেকেই বলেন, বাংলায় লিখতে হয় প্রচুর, কিন্তু নম্বর ওঠে কম। এ অভিযোগটি পুরোপুরি সত্য নয়। আপনার লেখা যদি পরিচ্ছন্ন ও তথ্যবহুল হয়, তাহলে পরীক্ষক অবশ্যই ভালোভাবে আপনার খাতা মূল্যায়ন করবেন। সাদামাটা লিখে কখনোই ভালো নম্বর পাবেন না। লেখায় থাকতে হবে প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয় সব তথ্য। অনেকের উত্তরপত্রে তথ্য কম, একই কথার পুনরাবৃত্তি ও ভুল তথ্য থাকে। এসব নম্বর কমিয়ে দেয়। ভুল বানান ও বাক্য, যতি চিহ্নের সঠিক ব্যবহার না থাকলেও নম্বর কম দেন পরীক্ষকরা। নম্বরের সঙ্গে উত্তরের পরিধির সামঞ্জস্য, আপডেট তথ্য ও অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ের অবতারণা আপনাকে এগিয়ে রাখতে পারে।
.
বাংলায় হাতের লেখা ও উপস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনার হাতের লেখা সুন্দর হলে ভালো। না হলেও খুব একটা অসুবিধা নেই। আসল বিষয় হচ্ছে, আপনি যা লিখছেন তা যেন স্পষ্ট হয়। অর্থাত্ পরীক্ষক আপনার খাতা পড়তে পারলেই চলবে। লেখায় অতিরিক্ত কাটাকাটি, হাতের লেখা অতিরিক্ত বড় বা ছোট হলে পরীক্ষক বিরক্ত হতে পারেন। কোনোমতেই বাংলাকে দায়সারাভাবে নেবেন না। এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে থাকুন। সাফল্য আসবেই।